ঘ্রান

Updated: Apr 25

কিছু গন্ধ রয়ে যায় আমাদের মনে , আমাদের ঘ্রানে ,অবচেতন ভাবেই অনেকদিন । সেই গন্ধের সাথে জড়িয়ে থাকে কিছু মানুষ , কিছু ঘটনা , কখনো আবার কিছু মুহূর্ত ।

যেমন আমাদের আড্ডার কথা বললেই -প্রথমে মনে আসে নীলুদের বাড়ির গরম চা ,আর গরম সিঙ্গারার গন্ধ আর খানিকটা দত্তর সদ্য নিভে যাওয়া সিগারেটের ফিল্টার ।

আজ আড্ডায় এসেই আমবাগানের সুমন বললো -

" ওকে পুড়িয়ে এলাম । তোদের মনে আছে ওকে ?"

নীলু বললো -

" নামটা না বললে চিনবো কেমন করে ?"

সুমন বললো -

"শ্রেয়সী ! ভ্যামোর সামনে বসতো নন্দবাবুর ক্লাস এ -মনে নেই ? "

মুহূর্তে আমার মনে এলো তার সুবাস। নন্দবাবুর পড়ার ক্লাসে আমার সামনে বসতো মেয়েটা । নাঃ-মুখটা আজ আর মনে নেই । তবে গন্ধটা আজো মনের এক কোনে রয়ে গেছে । গন্ধটা মনের ঠিক কোনখানে ছুঁয়ে যেত তা বলা মুশকিল -ঘ্রাণটা ভালোলাগার ও নয় আবার খারাপ লাগার ও নয় । সব কিছু ওই দুটি পাখির খোপে পুড়ে ফেললে যে বড্ডো মুশকিল ।

আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বরোদা বুঝলো কিছু ভাবছি । বললো ,

" অভিষেক ঠিক আছো তো ? মুখটা শুকনো লাগছে ।"

নীলু বললো -

" প্রেম টেম করতিস নাকি ওর সাথে ?"

সুমন বললো -

" তোর খালি বাজে বকা স্বভাব ।"

না ভালো আমার ওকে লাগতো না । মুখটাও মনে নেই । খুবই সাধারন ছিল মেয়েটি । অভ্যাস ছিল চুলটা পেছনে মেলে দেওয়ার ।

লম্বা চুল ,মসৃন পিঠ । সালোয়ারের খোলা পিঠটা ঢেকে যেত কালো রেশমের মতন চুলে ।ঠিক তখনি আমি পেতাম তার ঘ্রান ।

সুমন বললো -

" কাল ভোর রাতের দিকে মারা গেছে । দেখে মনে হচ্ছিলো যেন ঘুমিয়ে রয়েছে ।"


একবার মনে হলো সুমনকে জিজ্ঞেস করি - আচ্ছা ধুপ চন্দনের গন্ধের মাঝে তার সেই গন্ধটা পেয়েছিলিস ?

দত্ত এতক্ষন চুপ করে শুনছিলো , এবার বললো -

"এতো কম বয়সে চলে গেলো - কি হয়েছিল ?"

সুমন কিছু একটা বললো - আমার কানে এলো না ।

আমার মনে এলো তার সাইকেল এ বসে পড়া শেষে চলে যাওয়া । শরীরের অবয়বটা আবছা রয়ে গেছে এখনো সেই পুরোনো শহরে ।


বরোদা চেয়ার এ ঠিক হয়ে বসলো । বললো -

" অপঘাতে মৃত্যুতে মুক্তি নেই । আত্মার পারাপার হবে না এতো সহজে । বিভিন্ন স্মৃতিতে , অনুভূতিতে রয়ে যাবে তার উপস্থিতি ।

দত্ত বললো -

" আবার শুরু করলে ! "


আমি কেন জানি না উঠে দাড়ালাম । বললাম -

" আবহাওয়াটা খারাপ , মেঘ করেছে -আজ এগোই।"


বরোদা পেছন থেকে বললো - " সাবধানে বন্ধুবর ।"


*************************************************


সূর্য নেমে এসেছে । আকাশটা মেঘলা ।ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসার আগে -

ঠান্ডা হাওয়া বইছে ,অন্য কোথাও বৃষ্টি হয়েছে ।

শ্রেয়সীর বাড়ির সামনে থেকে ঘুরে এলাম । শান্ত নিঝুম হয়ে আছে পরিবেশ । যেন অতিথি চলে গেছে বহুদূর ।

বাড়ি ফিরে এসে শুয়ে পড়লাম ঘরে -কেউ নেই বাড়িতে । আমার এই ঘরের জানলা দিয়ে আজো আকাশটা দেখা যায় ।

শ্রেয়সীর মুখটা কিছুতেই মনে পড়ছে না । নাঃ শত চেষ্টা করেও না । শুধু মন দিচ্ছে তার ঘ্রাণটুকু । গন্ধ যে মনে এভাবে বাসা করতে পারে কে জানতো ।

ভাবনার অবকাশে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি ।

স্বপ্নে দেখলাম নন্দবাবু আমার পাশে বসে হাসছেন । সামনে বসে শ্রেয়সী চুল মেলে দিচ্ছে আমার মুখে- ঠোঁটে । বরোদা টিচার এর চেয়ার এ বসে মাথা নাড়ছে আর দত্ত বলছে দেশলাইটা পাস করো বস !


*************************************************


ঘুমটা ভেঙে গেলো । স্ত্রী কখন এসে দাঁড়িয়েছে আমার মাথার কাছে । অন্ধকার নেমে এসেছে । বাইরে পড়ছে হালকা বৃষ্টি । ঘন অন্ধকার জড়িয়ে রয়েছে চারপাশ । আবহাওয়া যেন নিস্তব্ধ ঠান্ডা ।

জিজ্ঞেস করলো -

"মনটা খারাপ নাকি ?"

আমি মাথা নাড়লাম ।

অন্ধকার আবছায়া ঘরে স্ত্রীর মুখটা নেমে এলো আমার মুখের ওপর । মুক্ত এলোকেশে ঢেকে দিলো আমার চারপাশ । ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁলো । তার ঠোঁট আরো গভীরভাবে মিশে গেলো আমার ঠোঁটে । অবিন্যস্ত চুল সে সরিয়ে দিলো ডানদিকে - চমকে উঠলাম -

নাকে এলো সেই ঘ্রান- ঠিক যেমনটা পেতাম নন্দবাবুর ক্লাসে - ঠিক যখন সে মেলে দিতো তার চুল ।

ঘ্রাণটা বড্ডো তীব্র ।

ঠোঁটে ঠোঁট রেখে আবেশে মিশে যেতে যেতে - দূর থেকে কানে এলো স্ত্রীর গলা -

" কি গো ভিজছি তো ! দরজাটা খোলো ।"


আর মনে এলো বরোদার বাণী - সাবধানে বন্ধুবর !

তারপর.... তারপর ...

তারপর ? তারপর আর কিছু মনে নেই । শুধু গন্ধের রেশটা রয়ে গেছে ।



Image used for Illustration under Creative Common license...

Short Story "Ghran" by Nisachar © www.hatekhori.net (2020)

Read on the Go. Download our app now : Click Here

(সব চরিত্র কাল্পনিক )