চিনেবাদাম পর্ব

আজকাল সেরকম ভাবে আর আড্ডা দেওয়া হয় না। সেই আসরগুলোও কম বসে । নীলু , দত্ত ,সিধু , আমবাগানের সুমন -সবাই ব্যস্ত ।আজ অনেকদিন বাদে আবার সুযোগ হয়েছে একসাথে বসার-একপেশে নিয়মের বাইরে ।


আমি গাড়িটা নিয়ে বেরিয়েছিলাম । একটা চক্কর দিলাম বেনারসির ফুচকার দোকানের সামনে দিয়ে ।

কানাইলাল স্কুলের সামনেটা বেশ অন্ধকার হয়ে আছে ।


গাড়ির আলোয় দেখলাম একজন মানুষ একটা উনুন , এক কড়াই বালি আর বেশ খানিকটা চিনে বাদাম নিয়ে বসেছে । আমাদের আড্ডার জন্য জমবে ভালো -শক্ত খোলস ভেঙে খাওয়ার মজাই আলাদা । তারপর খোলসের আড়ালে কতগুলো বাদাম লুকিয়ে আছে গা ঢাকা দিয়ে - সেটা আরেক রহস্য ।


গাড়িটা থামিয়ে নামলাম -

কিগো কত করে ?


মানুষটা মুখ তুলে চাইলো । মনে রাখার মতন চোখদুটো -বেশ টানাটানা ।

মুখে বসন্তের দাগ , গায়ের রং মিশমিশে কালো ।


-তিরিশ টাকা শ


দামটা শুনে আমাদের আড্ডার জন্য বেশ খানিকটা নিলাম ।

মানুষটা পেছন থেকে আমার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রয়েছে একদৃষ্টে !

বেশ বুঝলাম না দেখেও ।


আজকের আড্ডার আসরটা বসেছে ভাইটুর বাড়িতে ।আসরে উপস্থিত সিধু , দত্ত , সুমন ,ভামো, নীলু আর যুগল ।

বরোদা আমার সাথেই পৌঁছলো আসরে ।

দত্ত বললো -

সায়ন ওটা কি তোমার হাতে ? কিছু খাওয়ার নাকি ?


আমি হাসলাম , বললাম ,

তোমার আন্দাজ বটে -চীনাবাদাম -সবার জন্য -বরোদার গল্প আর সাথে চিনেবাদাম-খোলস ভেঙে ।


দত্ত হে হে করে একটা ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হেসে বললো -

তা যা বলেছো !


বড়ো খাটে সবাই বসেছে গোল করে । শুধু বরোদা চেয়ার এ ।

আমি চিনেবাদামের ঠোঙাটা খাটের মাঝখানে রাখলাম ।

দত্ত হেসে উঠে সবার আগে এক মুঠো তুলে নিলো নিজের সামনে । তারপর বললো -

- আহা ! সঙ্গে ঝালনুন ! ছোটবেলার কথা মনে করিয়ে দিলে ।


নীলু একটা খোসা ভাঙতে ভাঙতে বললো -

তা জোগাড় করলি কোথা থেকে ?


আমি হাসলাম , বললাম -

সে এক রহস্যময় ফেরিওয়ালা, চোখদুটো টানাটানা -যেন অন্ধকারেও কথা বলে ।

কিরে যুগল নে না।


আমি যুগল কে বাদাম নিতে বললাম ।

ছেলেটা একটু লাজুক ।আমাদের আড্ডার বাসিন্দা নয় ।

সে ভাইটুর মামাতো ভাই । মাঝেমাঝে আনাগোনা -তাই আমাদের আড্ডার সাথে পরিচিত হয়ে গেছে ।


যুগল চীনাবাদাম নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই বরোদা রে রে করে তেড়ে উঠলো ।

ভ্যামো তো ঘাবড়ে গিয়ে পরেই যাচ্ছিলো । সামলে নিয়ে বললো -

ধুর শালা ! চেল্লানোর কি হলো ?


বরোদা মাথা নাড়িয়ে বললো -

কিছু কারণ নিশ্চয়ই আছে

কেমন দেখতে তোমার ফেরিওয়ালা কে সায়ন ?


আমি বললাম -

মিশমিশে কালো -চোখদুটো টানাটানা , চোখে পড়ার মতন ।


বরোদা একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো -

যুগল -এই নামটা তোমার ভালো নাম তো ?


যুগল মাথা নাড়লো , বললো

হ্যাঁ ।


বরোদা বললো -

তুমি বাদাম খেলে ঘোর বিপদ !


দত্ত যুগলের দিকে তাকিয়ে বললো -

শুনো না এইসব গল্পকথা -যুগল ।


দত্ত নিজের থেকে কিছু বাদাম যুগলকে দিয়ে বললো -

এই নাও খাও -একটা গল্প ফাঁদার ধান্দা করছে বরোদা আর কিছু নয় ।


যুগল অবাকের রেশটা কাটিয়ে একটা বাদাম ভেঙে খাওয়া শুরু করলো ।

বরোদা মাথা নাড়লো ।

শুনলে না তো ! কে জানে কি বিপদ আসবে !


নীলু বাদাম চিবোতে চিবোতে বললো - কেসটা কি ?

বরোদা চেয়ার ঠিক করতে করতে বললো -

উদুপির নাম শুনেছ? উদুপি শহরের ?


দত্ত হেসে বললো -

কোথাকার শহর -মহেঞ্জোদারো না হারাপ্পা !


বরোদা পাত্তা না দিয়ে বললো -

কর্ণাটকের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত প্রাচীন শহর এই উদুপি ।একপাশে সমুদ্র ও কিছু দূরে ছোট ছোট পাহাড়ের সারি। বৌকে নিয়ে ঘুরতে গেছিলাম একবার । বেশ লেগেছিলো । ফিল্টার কফির স্বাদ এখনো মনে রয়ে গেছে ।


দত্ত বললো -

কি বললে হে বরোদা! মনটা যে এবার কফি কফি করছে । ভাইটু একটু ব্যবস্থা করবে নাকি ?


ভাইটু কফি বানাতে বলে ফিরে আসলে - বরোদা গল্প আবার শুরু হলো ।

-তা এই উদুপি শহরে এক বিশাল শ্রী কৃষ্ণের মন্দির আছে । আর কৃষ্ণ কোথায় যেন এই দক্ষিণের শহরের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গেছে ।

এবার ফিরে আসি আমার গল্পে । মহাভারতের সময় কাল । কুরুক্ষেত্র শুরু হবে হবে করছে । সারা ভারতবর্ষের রাজা মহারাজারা দু ভাগে বিভক্ত -পাণ্ডব ও কৌরবদের মাঝে । এমনকি কৃষ্ণ- বলরাম ও দুই আলাদা পক্ষে ।

উদুপির রাজাও পৌঁছলেন কুরুক্ষেত্রের মঞ্চে । কিন্তু তিনি মানসিক ভাবে স্থির করতে পাচ্ছেন না যে কোন পক্ষ নেবেন ? শ্রীকৃষ্ণের সাথে দেখা করলেন একান্তে । বললেন যে তিনি এই ভাতৃদ্বন্ধে পক্ষ নিতে দ্বিধাগ্রস্ত ।

কৃষ্ণ হাসলেন এবং তাকে সমাধান বাতলালেন ।

উদুপির রাজা ফিরে এলেন মানসিক শান্তি নিয়ে । কৃষ্ণ তাকে বলেছেন যুদ্ধের খাবারের দ্বায়িত্ব নিতে - দুপক্ষ মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লক্ষ্ সৈন্য -তাদের খাবারের দ্বায়িত্ব ।তা সে মুখের কথা নয় । কিন্তু তিনি এবং তার লোকজন তা সামলালেন বেশ নিপুন ভাবেই । কৃষ্ণের এই সমাধানে তাকে পক্ষ নিতে হলো না ।




এখানে গল্পের বাঘ্যাত ঘটলো । কফি এসে গেছে । ঘর গন্ধে ম ম করছে ।

বরোদা এক চুমুক দিয়ে বললো -

-সেই উদুপির ফিল্টার কফির স্বাদ না হলেও -ভাইটুর বাড়ির কফি ও তোফা ! চলবে ।


নীলু বললো -

সবই তো বুঝলাম কিন্তু যুগল , বাদাম ,কৃষ্ণ কিছুই মিলছে না যে !


বরোদা হাত তুলে নীলু কে থামালো ।

-আমি আসছি সে কথায় ।

কুরুক্ষেত্র চললো আঠেরো দিন । ভয়ঙ্কর সে লড়াই । কত প্রাণ গেলো ! সে গল্প অন্য এক দিনের আর বেশিরভাগই তোমাদের জানা ।

কুরুক্ষেত্র জিতলো পাণ্ডবেরা । সিংহাসনে বসলেন যুদ্ধিষ্ঠীর । ডেকে পাঠালেন উদুপির রাজাকে -তাকে তার সেবার জন্য ধন্যবাদ জানালেন ।

যুদ্ধিষ্ঠীর ওনাকে জিজ্ঞেস করলেন যে একটা প্রশ্নের উত্তর তার জানা দরকার । এতো মানুষ লড়াই করছিলো -এতো সৈন্য মারা গেছে প্রতিদিন -কিন্তু কোনোদিন খাবার বেশিও হয় নি আবার কম ও নয় !

সেটা কি করে সম্ভব !

উদুপির রাজা হাসলেন । ওনাকে বললেন -এতে ওনার কোনো কৃতীত্ব নেই । কৃষ্ণ বাদাম খেতে ভালোবাসেন ।প্রতিদিন যুদ্ধের পর কৃষ্ণকে বাদাম খাওয়ার জন্য দেওয়া হতো ।

তারপর ওনার খাওয়া হয়ে গেলে -বাদামের খোসা গোনা হতো । ধরুন উনি যদি দশটা বাদাম খেতেন -তাহলে পরেরদিন যুদ্ধে দশ হাজার সৈন্যের মৃত্যু হতো । সেই সংখ্যার ভিত্তিতেই উদুপির রাজা খাবারের পাঠ সামলেছেন যুদ্ধের এই আঠেরো দিন ।

তাই যা লীলা , কৃতীত্ব -মহিমা সবই শ্রী কৃষ্ণের ।


বরোদা দীর্ঘ শ্বাস ফেললো -

এখানেই আমার গল্প শেষ - চিনেবাদাম পর্ব ।


দত্ত নীলুর দিকে তাকিয়ে বললো -

কি বুঝলে ?


নীলু বললো -দারুন ! কিন্তু এর সাথে যুগলের বাদাম খাওয়ার কি সম্পর্ক ?


আমি বললাম -

আমি বলছি রহস্যটা ।


নীলু জিজ্ঞেস করলো - কিরকম?


আমি কফির শেষ চুমুকটা দিয়ে কাপটা রাখতে রাখতে বললাম -

আমার চিনাবাদামের ফেরিওলাকে দেখতে কেমন ছিল ?


দত্ত বললো -

চোখ দুটো টানাটানা -মিশমিশে কালো !


আমি হাসলাম , বললাম -

আর শ্রী কৃষ্ণের রূপের বর্ণনা করো শুনি -


দত্ত বললো -

স্বপ্ন মধুর চোখ, গায়ের রং এতটা কালো যে আমরা নীল রূপে কল্পনা করি ।


আমি বললাম -

আর কৃষ্ণের অসংখ্য নামের একটি নাম যুগল । আর সেটাই বরোদার যুগলকে বাদাম না খেতে বলার কারণ । কি বরোদা ঠিক তো ?


বরোদা বললো -

একদম -তা যুগল তুমি কটা বাদাম খেলে ?


যুগল বললো -

গোটা তিনেক !


ভ্যামো এতক্ষন চুপ করেই গল্প শুনছিলো -এবার বললো -

বরোদা গুলের একটা লিমিট আছে !


বরোদা চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লো । তারপর বললো -

আজ উঠি , কোনোদিন আমার বাড়িতে এলে ফিল্টার কফি খাওয়াবো দক্ষিণের ।


তারপর ভ্যামোর দিকে তাকিয়ে বললো -

বিশ্বাসে মেলায় বস্তু তর্কে ......




ঠিক পরেরদিন । সান্ধ্য আড্ডায় বরোদা নেই । আমরা এদিক ওদিক গল্পে ব্যস্ত । হঠাৎ !

সিঁড়ি ভেঙে দৌড়ে এসে হাজির ভাইটুর দিদি - হাঁপাতে হাঁপাতে বললো -

টিভিটা চালা । খবরটা দেখ ।


" চায়নাতে Covid এ মৃত্যু তিনহাজার মানুষের । মোদী লক ডাউন ঘোষণা করেছেন সারা দেশে । আরো জানতে চোখ রাখুন ....."


ভ্যামো আর নীলু একে অন্যের দিকে তাকিয়ে । আমিও থ !

দত্ত একটা সিগারেট ফস করে জ্বালিয়ে বললো -

"

চিনাবাদামের - " হ "

শ্রীকৃষ্ণের - " য "

যুগলের - " ব "

আর পরে রইলো র আর ল !

বিশ্বাসে মেলায় বস্তু তর্কে বহুদূর ।




Images used for Illustration under Creative Common License

Short Story " Chinebadam parbo by Nisachar " © www.hatekhori.net (2020)

Read on the Go. Download our app now : Click Here