• হাতেখড়ি- নির্বাচিত লেখা

মনীষ বাবুর কালো বেড়াল-সুমনা

ট্রেনটা স্টেশনে থামল রাত সাড়ে নটায় , কালকে রাতের ঝড়ে গাছ ভেঙে মাঝের কোনো এক স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিল দুঘন্টা, এমনটা না হলে সাড়ে সাতটার মধ্যে চলে আসতাম, মামামশাই আগেই বলেছিলেন,

"বুঝলে অমি, জায়গাটা কিন্তু রাতের বেলায় খুব একটা ভালো নয়! রাত কোরো না!"


মামামশাই এককালে এই হুতুমপুরের স্টেশন মাস্টার ছিলেন, যেমন চেহারা স্বাস্থ্য তেমন তাঁর সাহস, তাঁর মুখেই শুনেছি, এই হুতুমপুর নাকি রাতের বেলায় খুউউব বিপজ্জনক! আমার এখন নতুন চাকরি, আর নতুন ম্যানেজার এসে প্রথমেই বাঁধ ইন্সপেকশনের দায়িত্ব দিলেন আমার কাধে, তাও এই হুতুমপুরে ! আমি বেশি ট্যাঁটু করলাম না , কিন্তু মামামশাইয়ের কথা শুনে ও ঠিক স্বস্তি হচ্ছিল না!


ট্রেনটা স্টেশন থেকে কেমন যেন তাড়াহুড়ো করে ছেড়ে গেল, দেখলাম আমি ছাড়া আর কোনো যাত্রী নামলো না, জায়গাটা তেমন কাজের না, দেখেই বুঝলাম। স্টেশন চত্বরে কোনো আলো নেই, শুধু কাউন্টার ঘরটায় একটা টিমটিমে ক্ষীণ আলো জ্বলছে অতি দ্বন্দ্বে, আমি ব্যাগ থেকে টর্চটা বের করলাম, টর্চের আলোয় ওরম ঘুটঘুটে অন্ধকারে যতটুকু দেখা গেল তাতে বুঝলাম, আমি ছাড়া কোনো রক্ত মাংসের প্রাণী এই স্টেশন চত্বরে নেই, স্টেশন মাস্টারের ঘর খুঁজে পেলাম না অন্ধকারে, এই জীবৎকালে এরম নির্জন স্টেশন চত্বর দেখিনি বলে হয়তো আমার অস্বস্তি আরো বাড়ছে! আমি পদক্ষেপের সাথে টর্চের আলো মিলিয়ে কাউন্টার ঘরের টিমটিমে হলুদ আলোর সামনে এসে দাঁড়ালাম, সামনে একটা ছোটো জানলা পেলাম, কিন্তু জানলার ওপারে যে কি আছে, তা আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না, আমি একটু ইতস্তত হয়ে সন্তর্পনে বললাম,"কেউ আছেন কাউন্টারে?"


কোনো সাড়া নেই, অন্ধকার থেকে একটা টিকটিকির লেজ সঞ্চালনের শব্দ পাওয়া যাবে, এমন নিস্তব্ধতা!


টর্চের আলোটা ও আস্তে আস্তে নিভে যাচ্ছে, শেষ কয়েকবার মরণটানের মত জ্বলে উঠে, টর্চটাও নিভে গেল, বাইরে কালো আকাশ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পারছি না, তার উপর ঝোড়ো হাওয়াটা গায়ে বিঁধছে ক্যাকটাসের মত! হঠাৎ একটা চাপা বৃদ্ধ কন্ঠস্বর অন্ধকার ঠেলে আমার কাছে এগিয়ে এলো,

"কি চাই আপনার?"

কন্ঠস্বর টা আমার এত কাছে এগিয়ে আসবে হঠাৎ-হয়তো আশা করিনি,মুখ ঘুরিয়ে কাউন্টারের টিমটিমে হলুদ আলোয় দেখলাম দুটো চোখ, বেশ আবছা রকমের লাল, আমার চোখের থেকে দশ সেন্টিমিটার দূরে স্থির হয়ে আমাকেই দেখছে, আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিম স্রোত বয়ে গেল, আমি জানলার দিকে প্রায় ছিটকে গেলাম,

"কে???"

আমার প্রশ্ন শুনে লোকটি একটা হ্যারিকেন তাঁর মুখের সামনে তুলে ধরলেন, আবারও সেই চাপা কন্ঠে বললেন,

"কি চাই!"

এতক্ষণে আমি হ্যারিকেনের তুলনামূলক উজ্জ্বল আলোয় বুঝলাম, কন্ঠস্বর টি একজন রক্ত মাংসের মানুষেরই ! একটুকরো পাথর যেন বুক থেকে সরে গেল , আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "ইয়ে, মানে আমার নাম অমিত, অমিত চক্রবর্তী , আমি এই গ্রামের বাঁধ নির্মাণের ইন্সপেকশনে এসেছি, আজই, এই একটু আগে ! কিন্তু এত রাতে কোথায় যাব..."

বৃদ্ধ লোকটি বেশ কয়েকবার খুকখুক করে কেশে নিয়ে বললেন,

"কোথা থেকে আসা হচ্ছে?"

-" আজ্ঞে কলকাতা! "

-" আমার সাথে আসুন, আমার বাড়ি স্টেশন মোড় ফেলে বাঁদিকে হাফ কিলোমিটার, বাড়ির একতলাটা খালিই আছে"

বলেই ভদ্রলোক এগিয়ে যেতে থাকলেন, আমার সম্মতির ব্যাপারে কোনো প্রশ্নই তুললেন না, আমার অদ্ভুত লাগলো, একজন অচেনা কে এত রাতে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিচ্ছেন, তাও আবার তার সম্মতি না নিয়ে! কিন্তু এই মুহূর্তে আমার ও ওনার পথাবলম্বন ছাড়া কোনো উপায় ছিল না ! বুদ্ধির একদম শেষ প্রান্তে এসে ও আমি কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না! অন্ধকার টা স্টেশন মোড় থেকে আরো বেড়ে গেল খেয়ালই করলাম‌ না...

ভদ্রলোকের বয়স বছর পঁয়ষট্টি আশা করাই যায়, একরাশ কাঁচা পাকা চুল কপালটাকে অযত্নে ঢেকে দিয়েছে, গোঁফ আছে বটে কিন্তু শখে রাখেননি তা বোঝাই যাচ্ছে, পোশাক আশাক দেখে অনুমান করা যায় যে একদম গ্রাম্য কিংবা অতি দারিদ্রতার তেমন ছাপ নেই! আমি প্রশ্ন করলাম ,

"আপনার পরিচয়টা যদি..."

উনি স্থির চাহনি দিয়ে আমাকে নিরীক্ষণ করলেন এক পলক তারপর চাপা গলায় বললেন,"মনীষ..মনীষ চাটুজ্যে"

-"ও , আপনি এই গ্রামে কতদিন আছেন?"

-" পনেরো বছর"

-"তাহলে তো অনেকদিনই বেশ !"

উনি কিছু বললেন না আর, আমার প্রশ্ন করাটা বোধ হয় ওনার তেমন পছন্দ নয়, আমি চুপই রইলাম, হঠাৎ একসময় হাঁটতে হাঁটতে নিজেই বলে উঠলেন,

"আমি এই গ্রামের গ্রামীণ ব্যাংকের ম্যানেজার ছিলুম, সে অনেককাল আগের কথা, মুর্শিদাবাদ থেকে বদলি হয়ে এখানে যখন এলুম, তখন ব্যাংক টা খুবই অনুন্নত, ধীরে ধীরে একসময় প্রসার হল, উন্নত হল , এখন অবসর ! আমি আর আমার মহী , দুজন মিলে কেটে যায় বেশ !"

বুঝলাম ভদ্রলোক বৃদ্ধ বয়সে ওই একটিমাত্র সঙ্গীকে নিয়ে বেশ খুশিতেই দিন কাটাচ্ছেন, কিন্তু এই মহী টি কে? ওনার সন্তান নাকি কোনো কেয়ার টেকার, জিজ্ঞেস করতেও সাহস হচ্ছে না, প্রথম পরিচয়ে এত কৌতুহল বিরক্তির কারণ হতে পারে !

অনেক প্রশ্ন -দ্বিধা-দ্বন্দ নিয়ে হাফ কিলোমিটার পথ শেষ হয়ে একটা দোতলা বাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম, বাড়িটা গ্রামের ওতোটাও ভিতরে নয়, কিন্তু বেশ বড়ো আর ছিছাম-স্নিগ্ধ পরিবেশে মোড়া, ভদ্রলোক যে অর্থবান তা বাড়ির নকশা দেখে অনুমান করা যায়, এমন নির্জন, ভূতুড়ে গ্রামে এমন বাড়ি, আমি অন্তত আশা করিনি, মনীষ বাবু এতক্ষণে অনেকটা সহজ হয়ে গিয়েছেন, আড়ষ্টতা ভেঙেছে অনেকখানি, আমায় বললেন,

"ভিতরে আসুন"

সামনের একচিলতে বাগান পেরিয়ে আমরা ভিতরে ঢুকলাম, বাড়ির বাইরেটা যত অন্ধকার, ভিতরটাও ততখানিই! আমি ইতস্তত বললাম,

"আপনাদের এখানে ইলেকট্রিসিটি নেই না?."

উনি কোনো একটা বসবার কেদারা পরিস্কার করতে করতে বললেন-

"কালকের ঝড়ে চলে গিয়েছে, আপনি এইখানে বসুন, আমি আসছি!"

উনি একটি বেশ সেকেলে আরাম কেদারা লক্ষ্য করে আমাকে বসতে বললেন,

"এতোটা পথ এসেছেন, একটু বিশ্রাম নিয়ে নিন!"

মনীষ বাবু বসার ঘর ছেড়ে ভিতরে কোথায় মিলিয়ে গেলেন, সারাদিনের ক্লান্তির পর আমি আরামকেদারা পেয়ে নিজেকে এলিয়ে দিলাম, অবসাদের পর এত বিস্তৃত প্রশান্তি যে চারপাশের কালো টা যেন আমার দুচোখে কালবৈশাখীর মত নেমে এলো, আমি অতল ঘুমের নির্বাসনে তলিয়ে গেলাম,

কিছুক্ষণ পরই আমার ডান কাঁধের আগায় আর কানের উর্ধ্বাংশে একটা লোমশ শরীরের স্পর্শ অনুভব করলাম, স্পর্শটা নিতান্তই আমার স্বপ্ন বা কল্পনাপ্রসূত নয়, সেটা স্পষ্ট হতে থাকল, আমি চোখ খুললাম, ঘুমের আবেশ তখন ও কাটেনি, ঘাড় ঘোরাতেই দেখলাম দুটো চোখ অন্ধকারের মধ্যে জ্বলজ্বল করছে আমার দিকে তাকিয়ে, আর দুটো ভয়ানক সূঁচালো শিকারী দাঁত ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে গূঢ় অন্ধকারের কোল থেকে, মনে হচ্ছে যেন আমার গলার টুটি ছিঁড়ে খেতে আসছে , চকচকে দাঁত দুটো যেন একটা খুনির ধারালো তলোয়ারের মত আমার দিকে এগিয়ে আসছে, আমার এক মুহুর্তে মনে হল, হৃদপিন্ডটা পাথরের মত শক্ত হয়ে স্পন্দন স্তব্ধ করে দিতে চাইছে, আমার সমস্ত শরীরটা বরফের মতো জমে যেতে চাইছে, চোখ দুটো আমার দিকে এগিয়ে আসছে আরো, আমি একটা শেষ চেষ্টা করলাম, ডান হাত দিয়ে সজোরে ধাক্কা দিলাম, প্রাণীটা ছিটকে চলে গেল কিছুটা দূরত্বে, আর আমিও কেদারা ছেড়ে ছুটে চলে এলাম , শব্দ পেয়ে মনীষ বাবু পিছন থেকে এসে বললেন,'ও, মহী! এসেছিস?'

আমি দ্রুত নিঃশ্বাস নিতে নিতে বললাম,

"কে! কে ওটা?"


মনীষ বাবু আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না, ঘরের কোণে ছিটকে যাওয়া প্রাণীটার দিকে ছুটে গেলেন, মাটিতে রাখা হ্যারিকেনের আলোতে দেখলাম, মনীষবাবুর কোলে বসে রয়েছে একটি কুচকুচে বিড়াল, যার জ্বলজ্বলে চোখদুটো আমার দিকে তাক করে আছে, যেন বন্দুকের নিশানা স্থির, আর শিকারী দাঁতদুটো অন্ধকারকে সাক্ষী করে যেন একটা বন্য অভিসন্ধি নিয়ে বেরিয়ে আসছে ক্রমশঃ।


মনীষ বাবু রাতে আমায় একটি ঘর দেখিয়ে দিলেন, আজকের মতো খাওয়া দাওয়ার বন্দোবস্ত ও করলেন একা হাতে, বসার ঘরের পাশেই আরেকটি ছোটো ঘরে টেবিলে খাওয়ার আয়োজন হয়েছে, মুখে কিছু না বললেও সারাদিন ধরে আমার কিছু খাওয়া হয়নি, তাই মনীষ বাবু খাবার পরিবেশন করলেই আমি যেন গোগ্রাসে শুধু গিলে খেতে লাগলাম, মনীষ বাবু খেলেন কিনা সে বিষয়টি লক্ষ্যই করলাম না, খাবারটা অর্ধেক শেষ করার পর দেখলাম, টেবিলের ওপাশে মনীষ বাবু খাচ্ছেন আর ওই একই পাতেই মুখ দিয়েছে তার কালো বিড়াল মহী! গা গুলিয়ে উঠলো আমার , মনে হল, এতক্ষণ যা খেয়েছি, সে সব বেরিয়ে আসতে চাইছে, আমি মুখ চেপে উঠে পড়লাম।


বসার ঘরের আরাম কেদারায় বসে দীর্ঘক্ষণ মহীর সাথে গল্প করেন মনীষ বাবু, তিনি মহীকে প্রশ্ন করেন আর মহীও নাকি উত্তর দেয়, মনীষ বাবুর এই অভ্যেসের কথা মনীষ বাবু আমায় জানালেন এবং আমাকে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়তে বললেন, ঘটনাটা আমার খানিক অবান্তর পাগলামী ই মনে হল, অবশ্য মহীই ওনার বার্ধক্যের একমাত্র সঙ্গী!


আমি ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। রাতে ওঠার অভ্যাস আমার তেমন নেই, কিন্তু সেদিন সজোরে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে গেল, ভাবছিলাম উঠবো না, অচেনা জায়গা, অচেনা মানুষ! কিন্তু কিছুতেই ঘুমোতে পারলাম না, সন্তর্পনে বসার দিকে এগিয়ে গেলাম! মনীষ বাবুর হ্যারিকেন টা কেদারার পাশেই রাখা ছোট গোল টেবিলে জ্বলছে, কিন্তু মনীষ বাবু কেদারাতে নেই! কোথাও চলে গেলেন! নাকি শুয়ে পড়লেন , আর কালো বিড়াল টা?

আমি সাহস করে আর একটু এগিয়ে গেলাম, কেদারার পেছনের পায়ের কাছে মনীষ বাবুর উন্মুক্ত পা দেখলাম, আর একটু এগিয়ে যেতেই ভয়ানক একটা দৃশ্য দেখে চেঁচিয়ে উঠলাম, মনে হল যা দেখছি তা অবাস্তব বা অতিবাস্তব! কালো বিড়ালটা মনীষ বাবুর বুকের উপর বসে তার গলা থেকে মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে! আর মনীষ বাবুর একটা চোখ নখের খোঁচায় উপড়ে ফেলা হয়েছে। আমার রক্ত হিম হয়ে এলো, বসার ঘরের দেওয়ালে সিঁটিয়ে গেলাম, আমার পা সরছে না কালো বিড়ালটা মুখে শরীরে রক্ত মাখছে, যেন স্নান করছে রক্তের বন্যায়, হিংস্র দাঁতদুটো দিয়ে মনীষ বাবুর শরীর টাকে ছিঁড়ে যাচ্ছে ক্রমাগত!

ওর রক্তের পিপাসা মেটেনি এখনো, মনীষ বাবুর শরীরটাকে ছিন্নভিন্ন করে খাওয়ার পর সেই জ্বলজ্বলে চোখ দুটো দিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে ! আমি বসার ঘরের ছোটো গোল টেবিলটা ওর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে ছুটলাম, রুদ্ধশ্বাসে, মনীষ বাবুর বাগানের ইঁটে ছোচট খেয়ে পড়ে গেলাম, তখন ও কালো বিড়ালটা আমার দিকে এগিয়ে আসছে আরো!


তারপর চোখের সামনের দৃশ্য ক্রমশ আবছা হয়ে হতে একেবারে অন্ধকার।

যখন চোখ খুললাম, তখন চোখের সামনে কতগুলো মুখ আমার দিকে চেয়ে আছে বিষ্ময়ে, সূর্যের আলো ওদের জমায়েত এড়িয়ে আমার দিকে নুয়ে পড়েছে সামান্য। চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে শুয়ে আমি। একজন লোক আমায় প্রশ্ন করলেন,

"মশাই ! শুনছেন! আপনি মনীষ বাবুর বাড়িতে কি করছিলেন!"

আমি একটু সামলে বললাম,

"কাল রাতে উনিই আমায় ওনার বাড়িতেই নিয়ে গেলেন রাত কাটানোর জন্য!"

লোকটি বলল,

"বলেন কি মশাই! দু'বছর আগে ওনার পোষা কালো শিকারী বিড়ালের থাবাতেই ওনার মৃত্যু হয়!"



pictures used for illustration are under creative common licenses

Story © www.hatekhori.net (2020)

 

©2020-www.hatekhori.net

Contact Us at admin@hatekhori.net

You can also email your queries and Articles to the above email