অশ্বত্থামা-নিশাচর

Updated: Jul 19

আজকের আড্ডায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই জানতাম -নীলু ধরবে আগের দিনের গল্পের শেষের খোঁজে .....তাই আগে থেকেই একটু তৈরী হয়ে বসলাম। আজকে আবহাওয়া গুমোট গরম , বৃষ্টি হয়েছে সেই আগের সপ্তাহে , নিয়ম মেনে আজও কারেন্ট গেছে। একে একে সবাই আড্ডার আসরে জড়ো হচ্ছে , আজকে পার্থও আছে বাড়িতে। আড্ডার আসরে প্রায় আট জন, যেন অষ্ট চিরঞ্জীবী। সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছে ঘরের এদিকে ওদিকে , কেউ মেঝেতে , কেউ বা আবার খাটে, আর দত্ত বরাবরের মতন বালিশটা বগলদাবা করে খাটের মধ্যমনি ।


একটা হ্যারিকেন জ্বলছে- নীলুর টেবিলে...। নীলু একটু নড়েচড়ে বসলো ..বললো - তো আগের দিনের গল্পটা তো শেষ কর এবার ! আমি একটু মৃদু হেসে বললাম .. এই গুমোটে প্রেম জমবে না ভাই ...তার চেয়ে বরং তোরা বল দেখি অশ্বথামার গল্পটা জানিস ? দত্ত বললো সবার আগে ... ওই তো হাতির কেসটা...মারলো হাতি আর দ্রোণাচার্যকে কানে কানে গুল মারলো..ওই গল্পটা তো ! সিধু বললো হ্যাঁ,সেটা তো আছেই ..ও আসলে বলতে চাইছে অশ্বত্থামা নামক মানুষের মহাভারতের গল্পটা। কিরে তাইতো ? আমি হাসলাম ...সম্মতিসূচক মাথা হেলিয়ে বললাম তাহলে শোন্ -আমার সাথে অশ্বথামার দেখা হওয়ার ঘটনাটা। সায়ন জোর গলায় বলে উঠলো ... গুল মারার জায়গা পাস্ নি ...! যা খুশি বলছে ! ভামো হাত নেড়ে থামিয়ে বললো আঃ ! আগে শুনিই না। আমি প্রত্যেকের মুখের দিকে একবার করে চাইলাম ...বিশ্বাস অবিশ্বাসের আলোয়- হ্যারিকেন এর জুড়ি মেলা ভার ...

" অশ্বথামার তো মৃত্যু নেই ...সেটা তো জানিস ...অশ্বথামার কাছে এক মনি ছিল-কপালে-ঠিক মাঝখানে -যেটা ওকে সব কিছু-যেমন ধর মানুষ,রোগ ..ভূত দানব জন্তু জানোয়ার ...শত্রূ ...সব কিছুর থেকে রক্ষা করতো। কুরুক্ষেত্রের শেষে তো ব্যাসদেবের আজ্ঞা আর কৃষ্ণের মহিমায় সেটি গেলো ... কিন্তু কৃষ্ণর অভিশাপ এলো যে সে বেঁচে থাকবে কলিযুগের শেষ অবধি ..তবে একা নিরালায় জঙ্গলে , শরীর এর আঘাত থেকে বেরোবে পুঁজ ..রক্ত ...এক অভিশপ্ত একাকী জীবন ...এতটাই ভয়ঙ্কর যে মৃত্যু চেয়েও মৃত্যু পাবে না সে। " সুমন বললো ; প্যাথেটিক ... আমি বললাম ট্রাজিক ... সে কথা থাক ... "

আসা যাক সিন ২ : সাল ১১৯২...রাজপূত বীর পৃথ্বিরাজ চৌহানের তখন শিহাবুদ্দীন মহম্মদ ঘোরির সাথে যুদ্ধ চলছে ...তখন ওনার সাথে জঙ্গলে একদিন দেখা হয় অশ্বথামার ..উনি ওনাকে চিনেছিলেন কপালে থাকা গর্ত থেকে যেখান থেকে কৃষ্ণা মনি উপরে নিয়েছিল ...যার উল্লেখ আছে ওই শতাব্দীর শেষে লেখা পৃথ্বিরাজ রাসো বইটিতে ... নীলু বললো আর কি লেখা আছে ওই বইতে ? আমি হাসলাম - ওখানেই থেমে যায় লেখক ...হয়তো চাই নি রহস্য উন্মোচন হোক। এর পর কাট টু সিন ৩ ; গাদাগ , কর্নাটকে এক ব্রাহ্মণ থাকতেন। নাম নাড়ানাপ্পা। জ্ঞানী ছিলেন ..ওনার জীবনের একটাই স্বপ্ন ছিল --মহাভারত লেখা , তবে তা আদি রূপে। সময়ের সাথে অপভ্রংশ হয়ে চলা গল্পকথা বাদ দিয়ে। ভীরা নারায়ণ এর মন্দিরে উনি প্রার্থনা করে পুজো দিয়েছিলেন। স্বপ্নে এলো নারায়ণ ..বললো দ্বাদশী পরান এর দিন মন্দিরে যেতে ...এক ব্রাহ্মণ কে খুঁজতে যে সেই ভোজন থেকে সবার আগে চলে যাবেন ...তার সাথে কথা বলতে..তিনিই অশ্বত্থামা ...তার কাছে পূর্ণাঙ্গ মহাভারত শোনার আবেদন করলে তার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে। দত্ত আমাকে থামালো ... আমার স্বপ্নে কেউ আসে না ...এরম ...কত পুজো দিই! ভামো ওকে থামালো ... তাল টা কেটো না বস .../ আমি বললাম ... কে জানে দত্ত ? হয়তো আজ আস্তে পারে অশ্বত্থামা- তোমার বাড়ি ফেরার পর ! ভয় পেয়ো না তখন কিন্তু ....আমি অবশ্য পেয়েছিলাম ....সে কথায় আসছি ..পরে। সুমন বললো তারপর দেখা পেয়েছিলো নাড়ানাপ্পা- অশ্বথামার ? হাঁ দেখা পেয়েছিলো ..অশ্বত্থামা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল নাড়ানাপ্পা জানলো কি করে ? উনি তখন ওর স্বপ্নের কথা বলেন অশ্বথামাকে। অশ্বত্থামা মহাভারত বলার আগে ওনাকে দুটো শর্ত দিয়েছিলো -এক রোজ স্নানের পর ধুতি বা ভেস্তি পরে উনি মহাভারত লিখতে বসবেন আর ততক্ষনই লিখবেন যতক্ষণ সেই ধুতি ভেজা থাকবে ...সেই ধুতি শুকিয়ে গেলে শত চেষ্টা করলেও নাড়ানাপ্পার কলম থেকে মহাভারত আর আসবে না। আর দ্বিতীয় শর্ত ...কেউ জানবে না অশ্বথামার সাথে তার এই কথোপকথন। নাড়ানাপ্পা লিখে চললেন দিনের পর দিন রোজ নিয়ম মেনে ..এই ভাবে একদিন উনি পৌঁছলেন দুর্যোধন বধ পর্বে। তবে মানব ধর্ম অতি বিচিত্র বন্ধু ...নাড়ানাপ্পা বলে ফেলেন স্ত্রীকে এক রাতে ..শর্ত ভেঙে বসলেন তিনি ....নাড়ানাপ্পা বা কুমার ব্যাস এর মহাভারত সেখানেই শেষ। দত্ত বললো যাহ ! সালা বৌকে বলে দিলো ! ভামো বললো তুমি হলে বলতে না ? দত্ত হাসলো বিজ্ঞের মতন বললো ... বিয়ে টা আগে করো -তারপর চাপ বুঝবে ! নাড়ানাপ্পার নড়ে গেলো আর তুমি তো কোন ছাড়! পার্থ বললো আঃ ছাড়ো না তোমরা বড্ডো বাজে বকো..আরে তোমার সাথে ঘটনাটা বোলো এবার .. নীলু হারিকেনের আলোটা একটু কমিয়ে দিলো-কালসিটে পড়ছে কাঁচে.. বললাম তাহলে শোনো - আমার স্ত্রীর বাড়ি নাভিসারি গুজরাটে ...শহরটা খুব সুন্দর ..দক্ষিণ গুজরাটে পূর্ণ নদীর পাড়ে। শশুরমশাই রেল এর অফিসার ..বনেদি বাড়ির ছেলে। জমিদারি রাজপাট ছিল একসময় ...পুরোনো সম্পত্তি আছে কিছু এখনো। বিয়ের সময় তোমাদের সাথে আমার আলাপ ছিল না ...তাই বলে রাখি আমার বিয়েটা হয়েছিল ওই শহরেই ...ওনাদের আদি বাড়ি ওখানেই। বিয়েতে যৌতুক ও পেয়েছিলাম প্রচুর ...বিয়ের আংটি ...গলার হার ...কম নয় ওই বাজারে ...তো বিয়ের তিন চার দিন পর এক ভোরে -হাটতে বেড়িয়েছি পূর্ণ নদীর পার ধরে। সকালের ঠান্ডা হাওয়া গায়ে শিহরণ তুলছে ...পথ ঘাট খালি। সূর্য উঠবে উঠবে করছে। হঠাৎ দেখি এক ভিক্ষুক আমার পিছু নিয়েছে। চুল অগোছালো ..স্নানের বালাই নেই বললেই চলে ওর ...পা টা টেনে টেনে চলছে। আমি আমার চলার গতি একটু বাড়ালাম। কিন্তু বুঝতে পারলাম সেও বাড়িয়েছে। একে তো রাস্তা চিনি না ...তারপর এ কি আপদ ! এক জায়গায় এসে নদী বাঁক নিয়েছে- যেখানে রাস্তা শেষ আর সেখান থেকে শুরু হয়েছে জঙ্গল ...পালাবার পথ আর নেই। মন শক্ত করে হাত মুঠো করে ঘুরে দাঁড়ালাম। যতটা শক্ত হওয়া যায় আর গাম্ভীর্য্য মিশিয়ে জিজ্ঞেস করলাম " কি চাই ? তার দৃষ্টি দেখলাম আমার হাতের দিকে .......আমার বাম হাতের তর্জনীতে আমার বিয়ের আংটি ...যদিও বিয়ের রাতেই বুঝেছিলাম ঠিকমতো ফিট হয় নি-তাও স্ত্রী দুঃখ পাবে বলে খুলি নি ..এখন দেখি ওটার জন্য প্রাণ যাবে ..বেঘোরে। আমি আবার জোর গলায় হাঁকলাম ...যাহ -ভাগ এখন থেকে ...আমার বাংলা মিশ্রিত হিন্দি শুনে সে কতটা ভয় পেলো তা জানি না ...শুধু দেখলাম দূরে একটা কাক উড়ে গেলো ..বিরক্তিসূচক আওয়াজ করে। সে তার আঙ্গুল টা ঠোঁটের কাছে এনে বললো শহহহ্হঃ ...একদম চুপ ...। আমি অবাক ...পরিষ্কার বাংলা ...। আস্তে আস্তে হাতটা বাড়ালো আমার তর্জনীর উপর আংটির লোভে আর বাঁ হাতের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে আমার কপালের মাঝখানটা চিপে ধরলো ...গা থেকে অদ্ভুত দুর্গন্ধ ..চোখটা ঘোলাটে , অজ্ঞান হওয়ার আগে তার কপালের গর্তটা দেখলাম ..চিনলাম তাকে ...অশ্বত্থামা... যার মৃত্যু নেই ...তারপর ...তারপর তখন আর কিছু মনে নেই... নীলু প্রায় উঠে এসেছে মেঝে থেকে খাটে ...বললো তারপর কি হলো ? বললাম তারপর ....চোখ খুলে দেখি সেই আগের দিনের গল্পের বাস এর সেই মেয়েটি ...কি সুন্দরী না লাগছিলো তাকে .. নীলু বললো ধুর সালা সে এলো কথা থেকে ? দত্ত বললো আহা তোমরা বড্ডো দেরিতে বোঝো ! আগের দিনই তো ও বললো উনি ওর গিন্নি ...তা জ্ঞান হওয়ার পর কবি চোখ খুলে গিন্নিকে দেখলো ..উফফ ... নীলু বললো তা ও সেটা বললেই হয় ! সুমন হাসছে মৃদু মৃদু। পার্থ বললো " আংটি টা -ওটা ছিল না গেছে ? আমি হাসলাম বললাম ছিল অক্ষতই... ভামো বললো নিতে পারে নি ? বললাম না হে ভায়া ..নারায়ণের অভিশাপ ..ওতো সোজা তো নয় -ওর মনি ফেরত নেওয়া ....বংশপরম্পরায় রয়ে যাওয়া আমার বিয়ের আংটিটি যে সেই দুষ্কর মনি সেটা আমার গিন্নির পরিবারের কেউ জানে না ...বলিও নি ...তোমাদেরই প্রথম বললাম.....। " সবাই ঘরে চুপ ...মুখ দেখা যাচ্ছে না ..বুঝলাম গল্পটা প্রসেস করছে মনের অলিন্দ্যে ... নিলুই প্রথম প্রশ্নটা করলো বললো কোথায় সেই আংটি - দেখাও দেখি !!! শুভাশিস বললো সাবাস কবি -এই জিনিস তুমি রেখে এরম নির্লিপ্ত ভাবে বসে আছো ! দেখাও ..দেখাও গুরু ... হাসলাম বললাম নিশ্চয়ই দেখতাম তোমাদের ...আগেই বললাম না- ঠিক মতো ফিট হতো না তর্জনীতে ...পিতৃপুরুষ তর্পনের সময় সেবার মহালয়ার এক সকালে গঙ্গায় সেই যে ভেসে গেলো আর ফিরে পাই নি ... খাট থেকে নেমে পড়লাম-উঠে দাঁড়ালাম ...বললাম আজ চলি সাইকেলটা ও সারাতে হবে ..আজ আর কারেন্ট আসবে বলে মনে হচ্ছে না... চলি কাকিমা ... হারিকেনটা জানলার এক দু টুকরো হাওয়াতে এই গুমোট পরিবেশেও কেঁপে উঠছে ..মনে হচ্ছে হাসছে আর মাথা দোলাচ্ছে অবিশ্বাসে ... বরোদার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে নীলু - ভামো আর সায়নের দিকে তাকিয়ে বললো - মালটা গুল দিলো না সত্যি ? দত্ত বালিশে মাথা রেখে দুহাত মাথার পেছনে দিয়ে শুতে শুতে বললো - " অশ্বত্থামা হত ইতি গজ "

 

©2020-www.hatekhori.net

Contact Us at admin@hatekhori.net

You can also email your queries and Articles to the above email