একটি প্রেমের গল্প -নিশাচর

Updated: Jul 19


সেদিন আড্ডাটা বেশ জমেছে। নীলু সবে বসে একটা বিড়ি ধরিয়েছে , দত্ত বালিশটা পাঁজাকোলা করে হেলান দিয়ে বসেছে।


কারেন্ট গেছে অনেকক্ষন আগে, কিন্তু কালবৈশাখীর ঠান্ডা হাওয়ায় নীলুদের দোতালার ঘরে তখন এক মনোরম পরিবেশ ...বৃষ্টিও নেমেছে মৃদু তালে।

খাটের অন্যদিকে শুভাশিস, সিধু আর সায়ন...আমবাগান এর মেঠো পথ দিয়ে আজ সুমন এসে পৌঁছয় নি...ভামোর দেখা নেই ...।

সায়ন বললো -আবহাওয়াটা প্রেম পড়ার আদর্শ ...।

সিধু সহমত জানালো।

দত্ত মৃদু হেসে বললো -প্রেমে তো আমি সবসময় পড়ি !

আমি বললাম ...তো প্রেমে পড়ারই গল্প হোক আজ।

নীলু আর একটা বিড়ি ফস করে জ্বালিয়ে বললো-

হোক।

আমি আবছায়া অন্ধকারে গল্প শুরু করলাম -

সেবার মাসির বাড়ি থেকে ফিরছি ..কাঁথি থেকে কলকাতা। মাসি উঠিয়ে দিয়েছে বাসে।

রাতের বাস ...দুরন্ত গতিতে চলছে বাস।

মনে হয় আমরা যখন বয়সে ছোট থাকি সব কিছুই যেন একটু বেশিই দ্রুত চলে

সিধু জিগালো -তা তোর তখন বয়স কত ?

বললাম -

পনেরো হবে ...গোফের রেখা বেশ ভালোই ফুটেছে ...হাত বুলিয়ে চুল ব্যাকব্রাশ করি।

..সে ছাড়...গল্পে ফিরি ...।

পাশে বসেছে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। মাঝে মাঝে ঢুলছেন।

বাইরে আবহাওয়াটা ঠিক আজকের মতোই ...জল এসে ঝাপ্টা মারছে কাঁচে, বাস অন্ধকার ...বাইরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে মাঝে মাঝে ...তাতেই দেখছি মাঠ ঘাট পেরিয়ে আমি চলেছি।

তখনি দেখলাম তাকে ...

বিদ্যুতের আলোয় দেখলাম তার চোখ। সত্যি বলছি ভায়া অমন চোখ আর দেখি নি ... !

আলো আঁধারে মায়াবী এক চোখ ...যেন পার্থিব হতেই পারে না।

দত্ত এবার উঠে বসেছে -কোথায় দেখলি বাইরে ?

আমি মাথা নাড়লাম -

না রিফ্লেকশন এ ...সে বসে আছে সামনের সিটে জানলার ধারে ...আমারি মতো।

শব্দে বোঝানো দুস্কর ..সেই তস্কর আঁখি ..।

মনে ভাবছি এটা কি বাস এর window নাকি আমার window of opportunity !

শুভাশিস হেসে বললো

লাভ আট ফার্স্ট সাইট !!!

আমি হাসলাম

ঠিক লাভ বলা চলে না তবে প্রেমে পড়া তো নিশ্চয়ই।

বাস এগিয়ে চলেছে বৃষ্টির বুক চিরে ..আমি ভাবছি এই চলাটা যদি চলতেই থাকে !

অপেক্ষা করছি বিদ্যুতের ...সেই আলোয় ভেসে উঠবে ক্যানভাস ...জল ধুয়ে দেবে আবার ...তারপর আবার অপেক্ষা।

নীলু সোজা হয়ে বসলো,কাকিমা এসে চা আর চপ দিয়ে গেছেন। কারেন্ট এর এখনো দেখা নেই।

তবে সবাই তাকিয়ে আমার দিকে ...

দত্ত মৃদু হেসে একটা চপ তুলে বললো -থামলে কেন ভায়া ..?

আবার শুরু করলাম -

রাত তখন অনেক ...বাস এর গতি সয়ে এসেছে।

মানুষজন শুয়ে পড়ছে..কথার রেশ কমে এসেছে। আমার পাশের ভদ্রলোক হেলে পড়েছেন আমার গায়ে।

ঠিক তখন, কি হলো আমার জানি না ...এমনিতে আমি সাহসী বলে আমায় কেউ বদনাম করবে না... কিন্তু হাতটা বাড়িয়ে দিলাম সিট আর জানলার মাঝখান দিয়ে ...বাইরে বৃষ্টি আর ভেতরের AC র যুগলে -ভেতরের কাঁচেও মৃদু জল ...একটা নৌকা আঁকলাম ক্যানভাসে আবার হাত ফিরিয়ে আনলাম।

তখন হৃদয় চলছে ১৮০ মাইল বেগে ...সে কি জেগে আছে ? নাকি ঘুমন্ত?

আমার হাতে জাদু কাঠিও নেই ! আমার মন তখন কেন্দ্রীভূত ওই একটি কাঁচে...পৃথিবীর সবচেয়ে দামি কাঁচ ...।

মনে এলো বিভূতিভূষণের নাবালক গল্পটি ...আর মনে এলো একটা নাম নয়নতারা ...

সত্যি নামটি যেন জাস্টিফায়েড উইথ টাইম এন্ড স্পেস ..কি কোএক্সিস্টেন্স আমার আর বিভূতিভূষণের নয়নের ...

নীলু বললো- তারপর ?

তারপর সে আঁকিবুকি কাটলো কাঁচে আর বিদ্যুৎ এর অচিন আলোয় দেখলাম তার চোখ আর তার আঁকা ঢেউয়ের বুকে আমার নৌকা চলমান।

বোলো কি হে বন্ধুবর !

বললাম

There are cemeteries that are lonely,

graves full of bones that do not make a sound,

the heart moving through a tunnel,

in it darkness, darkness, darkness,

like a shipwreck, we die going into ourselves,

as though we were drowning inside our hearts,

as though we lived falling out of the skin into the soul.

ওটাই তখন আমার মৃত্যু ওটাই তখন আমার জীবন ...সেটাই তো প্রেমে পড়া ...

নীলু বললো তারপর ' একটা কিস /

বললাম শোনোই না !

দত্ত বললো -আহা! ডিসটার্ব করো না ফ্লোটা থাকতে দাও ..তুমি বোলো প্রেমিক ...

এরপর কত অলীক কল্পনা এলো মনে ....পাশের ভদ্রলোক কেও আর বিরক্ত বলে মনে হলো না ...শুধু আমাদের দুজনের অপেক্ষা ..বিদ্যুতের আলোয় লুকোচুরি আর প্রেম ...আর ক্যানভাস মুছে আবার নতুন যুগলবন্দী ..

এরই মাঝে ঘুম নেমে এসেছে চোখে ..সেরম ঘুম আজ অবধি আর হয় নি ...স্বপ্ন আর ঘুমের সে মেলবন্ধন রবিশঙ্করের সেতারের মূর্ছনাকেও হার মানায় ...

দত্ত বললো - পরদিন সকালে কি বললে তাকে ?

আমি মৃদু হাসলাম ... গল্পের শুরুতেই বলেছিলাম বন্ধু গল্প টা প্রেমে পড়ার -প্রেমের নয় !

সকাল যখন উঠলাম -সামনের সিট খালি ...সে নেমে গেছে মাঝে ...একবার মনে হয়েছিল বাস থেকে নেমে দৌড়ে যাই তার খোঁজে ...জানলায় ক্যানভাস খালি ...

নীলু বললো নিশ্চয়ই একটা হৃদয় এঁকে দিয়েছিলো তোমার জন্য বন্ধুবর !

আমি হাসলাম, বললাম হয়তো !

বাইরে ঝড় থেমেছে ...আজ আর তাসের আড্ডা জমবে না , বললো সিধু

বললাম

আজ উঠি ....

দত্ত বললো -গিন্নি জানেন ?

আমি মৃদু হাসলাম ...

ছাতা বাগিয়ে বললাম -

তিনি যে তিনি নন তাই বা তুমি জানলে কি ভাবে !

নীলু ভ্যাবাচেকা খেয়ে বললো - মানে ?

বললাম রোসো

সে গল্প অন্যদিন ...চলি কাকিমা ..





*****************************************************

 

©2020-www.hatekhori.net

Contact Us at admin@hatekhori.net

You can also email your queries and Articles to the above email